রবিবার ১৪ জুন ২০২৬
Online Edition

ভর্তিবাণিজ্য প্রসঙ্গ

রাষ্ট্রের বিধিবদ্ধ নিয়মকানুন এমনকি উচ্চতর আদালতের নির্দেশনা জারি থাকা সত্ত্বেও রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ছাত্রছাত্রী ভর্তির নামে দেখা যাচ্ছে লাগামহীনভাবে ভর্তিবাণিজ্য। সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কঠোর নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও সেই নীতিমালাকে সরাসরি অগ্রাহ্য করেছে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। অনেক স্কুলে বাড়িয়েছে মাসিক বেতনের টাকা। কোন কোন স্কুলে মাসিক বেতন প্রায় দ্বিগুণ বাড়ানো হয়েছে। এদিকে বলা হচ্ছে, কোচিং নিষিদ্ধ করা হলেও অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবকদের উপর বাধ্যতামূলকভাবে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে কোচিংয়ের বাড়তি টাকা। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো চলে গেছে মধ্যবিত্ত মানুষের লাগালের বাইরে। বর্তমান বাস্তবতায় শিক্ষা গবেষকরা বলছেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী সরকার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাণিজ্যের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। তারা মনে করেন, দেশের শিক্ষাকে প্রচ্ছন্ন আওয়ামীকরণ ও বাণিজ্যকরণের কারণেই প্রতি বছরই লাখ লাখ শিশু-কিশোর শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, ঝরে পড়ছে। এ প্রসঙ্গে মাশিউ’র চেয়ারম্যান একটি সংবাদপত্রকে বলেছিলেন, আমরা বিষয়গুলো মনিটরিং করছি। তার মতে, স্কুলগুলোর বাড়তি ফি আদায়ের প্রবণতা এখন নেই। এরপরও অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবেন বলে তিনি জানিয়েছেন।
গত কয়েক বছর ধরেই সারাদেশে ভালো উন্নত মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংকটকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই নীতি বহির্ভূত ভর্তি বাণিজ্যের বিষয়টি প্রকাশ্য ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। সারাদেশে প্রায়ই দেখা যায়, শিক্ষার্থী ভর্তির সময় এলেই শুরু হয় নানা অনিয়ম, অব্যবস্থা, দুর্নীতি। এসব দেখার জন্য সৎ, নীতিবান, দায়িত্বশীল কেউ না থাকার কারণেই প্রকৃত অবস্থার কোন পরিবর্তন হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে সরকারি আইন-কানুন এবং বাস্তবতার মধ্যেও নানা ধরনের ফাঁকফোকর রয়েছে। দেশে চলে আসা প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী যে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি অর্থ সাহায্য পায় না, তাদের ব্যাপারে সরকারি নিয়মনীতির বাধ্যবাধকতাও তেমন লক্ষণীয় নয়। একই সাথে এটাও অস্বীকার করা যাবে না যে, সরকারি অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার নামে চলছে বেপরোয়া দায়িত্বহীন আচরণ। যে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি অর্থ গ্রহণ করে না তাদের মধ্যেই একটি বড় অংশের প্রতি অনেক অভিভাবকের ঝোঁক। কারণ শিক্ষার মান। দেখা যায় এ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম টাকা নেয়া হয় দেখানো হলেও গোপনে নেয়া হয় অনেক বেশি টাকা। এ কথাটাও বলা প্রয়োজন যে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনার দায়িত্বে যে সকল জ্ঞানী-গুণী, রথী-মহারথীরা রয়েছেন তাদের অনেকের মধ্যে অবৈধ উপায়ে বাড়তি টাকা কামানোর এক ধরনের মানসিকতা রয়েছে। এসব টাকা উন্নয়নের নামে আদায় করে হলেও কার্যত এসব টাকার বেশিরভাগই দুর্নীতিবাজ চক্র নিজেরাই ভাগবাটোয়ারার মাধ্যমে সাবাড় করা হয়। নিয়মিত দেখাশোনার বা হিসাবপত্র না নেয়ার দায়িত্বশীল কেউ না থাকার কারণে এসব টাকায় কোন কোন কর্তৃপক্ষের জমাজমি, বাড়ি-গাড়িও হয়। অন্যদিকে যে শিক্ষকদের বেতন-ভাতার কথা বলে টাকাকড়ি নেয়া হয় দেখা যায় তাদের ভাগ্যে অতি সামান্যই জোটে। চরম দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, প্রতিবছর, প্রতিবারই এসব অনিয়ম, অব্যবস্থা ও দুর্নীতি নিয়ে সংবাদপত্রসমূহে বিস্তর লেখালেখি করার পরও আজ পর্যন্ত পরিস্থিতির কোন পরিবর্তনই হয়নি। কেন হয়নি, দায়িত্বশীল মহল এর জবাব দেবেন কী?
ভর্তি বাণিজ্যের বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। রাজধানী ঢাকা মহানগরসহ দেশের অনেক নামিদামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সময়ে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে নেয়া অতিরিক্ত টাকা ফেরত দিতে বলা হয়েছে। এরপরও অনেক ধরনের খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকৃত অর্থে ছাত্র-ছাত্রী বা অভিভাবকরা তাদের দেয়া বাড়তি টাকা কেউ ফেরত পেয়েছেন কিনা তা জানা যায়নি। উচ্চতর আদালত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটিতে সংসদ সদস্যদের না থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন। এ বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কার যে, এ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, স্বজনপ্রীতি, দলবাজি ও আর্থিক দুর্নীতির বিষয় স্পষ্ট হয়ে দেখা দিয়েছে। এই প্রবণতার একটি কৌশলী দিক হচ্ছে সরাসরি না নিয়ে বিভিন্ন সাজানো খাত দেখিয়ে বেশ কয়েকগুণ বাড়তি ফি আদায় করে নেয়া। এর সাথে প্রভাবশালী নানা মহল জড়িত রয়েছে তাও অমূলক নয়। এটা কোন বিবেচনাতেই দেশের শিক্ষাবান্ধব নীতি হতে পারে না। এর ফলে সমাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়াটাই স্বাভাবিক। যেভাবেই হোক, যে কারণেই হোক এ প্রবণতাকে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি না বলে অন্য কোনভাবে দেখার সুযোগ আছে কী? দেশের মানসম্মত শিক্ষা এবং একটি শিক্ষিত ও উন্নত জাতি গঠনে সংশ্লিষ্ট সকলে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এবং অনৈতিক ও অবৈধ টাকা-পয়সা নেয়া থেকে বিরত থাকবেন এটাই আমরা আশা করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ